Skip to content
মেঘপত্র মেঘপত্র মেঘপত্র

শব্দের ডানায় ভর করে কল্পনার আকাশে

মেঘপত্র মেঘপত্র মেঘপত্র

শব্দের ডানায় ভর করে কল্পনার আকাশে

  • হোম
  • সাক্ষাৎকার
  • অনুবাদ
  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • গল্প
  • চলচ্চিত্র
  • চিত্রকলা
  • ছড়া
  • নাটক
  • প্রবন্ধ
  • বই নিয়ে
  • বিশেষ সংখ্যা
  • আড্ডা
  • অন্যান্য
  • ভিডিও
  • হোম
  • সাক্ষাৎকার
  • অনুবাদ
  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • গল্প
  • চলচ্চিত্র
  • চিত্রকলা
  • ছড়া
  • নাটক
  • প্রবন্ধ
  • বই নিয়ে
  • বিশেষ সংখ্যা
  • আড্ডা
  • অন্যান্য
  • ভিডিও
মেঘপত্র মেঘপত্র মেঘপত্র

শব্দের ডানায় ভর করে কল্পনার আকাশে

মেঘপত্র মেঘপত্র মেঘপত্র

শব্দের ডানায় ভর করে কল্পনার আকাশে

  • হোম
  • সাক্ষাৎকার
  • অনুবাদ
  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • গল্প
  • চলচ্চিত্র
  • চিত্রকলা
  • ছড়া
  • নাটক
  • প্রবন্ধ
  • বই নিয়ে
  • বিশেষ সংখ্যা
  • আড্ডা
  • অন্যান্য
  • ভিডিও
  • হোম
  • সাক্ষাৎকার
  • অনুবাদ
  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • গল্প
  • চলচ্চিত্র
  • চিত্রকলা
  • ছড়া
  • নাটক
  • প্রবন্ধ
  • বই নিয়ে
  • বিশেষ সংখ্যা
  • আড্ডা
  • অন্যান্য
  • ভিডিও
সাক্ষাৎকার

কী ভেবেছি সারাবেলা

By মাহমুদুর রহমান
October 1, 2025 9 Min Read
0

এক

কেউ যখন কবিতার নিরবচ্ছিন্ন প্রেমে পড়ে, সম্ভবত তখন থেকে তা সে লেখার চেষ্টা করে। স্নায়ুর গভীরে পৌছার আগে কিংবা অনুভূতির তাৎক্ষণিকতায় অথবা ইন্দ্রিয়ের সীমা পেরুতে পেরুতে সেগুলির বেশির ভাগই হারিয়ে যায়। এও বলা যেতে পারে, আকার দেওয়ার প্রস্তুতি যথেষ্ট না-থাকলে সেসব অপ্রকাশিত রয়ে যায়। কিন্তু সবই কি আকারযোগ্য? বা, কবিতা বলে যে ধারণা পাঠ্যপুস্তকের বদৌলতে সাধারণভাবে প্রতিষ্ঠিত, তার অনুগামী হয়ে কিছু প্রকাশ করলেই কাম্য জিনিশটির সাক্ষাৎ মিলে যায়? এ ধরনের প্রশ্ন খুব প্রাথমিক, অনেকটা হেঁয়ালি [কিন্তু সৃষ্টিশীল হেঁয়ালিও যে কবিতা, তা দেখিয়েছেন ফরাসি প্রতীকবাদীরা] বলে মনে হয়। তবে যেকোনো কবিতাই শেষপর্যন্ত আচ্ছন্নতাজাত সৃষ্টিশীল কল্পনার অর্থপূর্ণ প্রকাশ।

যা হোক, কবিতার প্রেমে আমিও পড়েছিলাম। সে অভিজ্ঞতা সর্বঅর্থে যথেষ্ট প্রীতিকর ছিল না। লেখার নয়, পাঠের কথা বলছি। প্রেমের মধ্যে যখন অনুসন্ধানী চিত্ত প্রবেশ করে, তখন ফাঁকফোকরগুলো বের হতে থাকে; যেমন পাঠের একপর্যায়ে লক্ষ করলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত [১৮২৪-১৮৭৩] শুরু করেছিলেন ভুল জায়গা থেকে। মহাকাব্য রচনার দরকার তাঁর ছিল না; সেই যুগ অন্তত দেড়শ’ বছর আগে ফুরিয়ে গিয়েছিল। তবে এইজন্য তিনি মহান হয়ে ওঠেন যে বাঙালি ও বাঙলা ভাষার জন্য একটা মহাকাব্য জরুরি ছিল। অন্তত সাহিত্যের ইতিহিাসগত স্ট্যাটাস বা মর্যাদার দিক থেকে। কিন্তু বাস্তবিক, মেঘনাদবধ কাব্য [১৮৬১] পরবর্তী বাঙলা সাহিত্যভাষার দিকে তাকালে এই প্রশ্ন এড়ানো কঠিন—ওই গ্রন্থের দরকার তখন ছিল কি-না; বা, কতটা ছিল!  ফরাসিদের মন উনিশ শতকেও হাহাকারে ভরে উঠেছিল। কারণ, তাদের কোনো মহাকাব্য নেই। কিন্তু সেই শূন্যতা তারা পূরণ করতে পেরেছিল একটা খুব তীব্রব্যাপক কবিতাবিপ্লবের মধ্য দিয়ে, যার স্পন্দন আজও টের পাওয়া যায়। তা হলো প্রতীকবাদ। যদিও মহাকাব্যের সংহতি ও আড়ম্বর ভিন্ন একটা ব্যাপার, খণ্ডের মধ্যে সমগ্রকে দেখানোর শত চেষ্টা কিংবা সফলতায়ও সে-জায়গার সমীপবর্তী হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু যা আগে লেখা হয়ে গেছে, ফরাসিরা তাতে ফিরে যায় নি; তারা সামনের দিকে তাকিয়েছিল। যাদের দৃষ্টি যত সম্মুখে প্রসারিত হয়, ততই সে এগিয়ে যেতে পারে এবং অন্যরা তাদের পেছনে পড়ে যায়। বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের শূন্যতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত পূরণ করেছিলেন বটে; উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে একে বড় কিছু বলে ভাবতে আমি রাজি নই। বরং মনে হয়, এতে পিছিয়ে পড়েছে বাঙলা কবিতা, অন্তত দেড়’শ বছর পেছনে চলে গেছে। মেঘনাদবধ কাব্য এখন উদাহরণ, সাংস্কৃতিক গৌরবের একটা প্রতীক মাত্র; বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি কাব্যটির প্রধান সম্বল, যা নিয়ে গম্ভীর ও নিষ্ফল গবেষণা হতে পারে। এমন-কি, ভাষার অগ্রগমনের প্রশ্নে এর ভূমিকাও বিবেচ্য। সমস্যা হলো, এটি রচনার পর বাঙলা ভাষায় মহাকাব্য ‘লেখা’র হিড়িক পড়েছিল, তাতে অপচয় ও আবর্জনার পাহাড় বেশ উঁচু হয়েছিল। বিশ শতকেও বাঙালি মহাকাব্য লিখেছে এবং কোনোটিই, হায়, সাহিত্যের কাজে আসে নি। শার্ল বোদলেয়ারের [১৮২১-১৮৬৭] লে ফ্ল্যুর দ্যু মাল প্রকাশিত হয়েছিল বাঙালির মহাকাব্য রচনার চার বছর আগে, অন্তত এই তথ্যের স্পন্দনটুকু তখন জরুরি ছিল।

মাইকেল শুরু করেছিলেন ভুল জায়গা থেকে: বিহারীলাল চক্রবর্তীও [১৮৩৫-১৮৯৪], এমন-কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [১৮৬১-১৯৪১], বাঙলা কবিতায় যাঁর অবদান তীব্রবিপুল ও প্রাতঃস্মরণীয় এই দিক থেকে যে, ভাষার আড়ষ্টতা ও অপরিণত অবস্থা কাটিয়ে ওঠার অনুশীলন তিনি করে গেছেন এবং অন্য কবিদেরও এই শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ধরেছিলেন বিহারীলালের পথ, তাতে কাটিয়ে দিয়েছেন দেড় দশকের বেশি সময়। কী ভুল তিনি করেছিলেন? যে চেতনাবদল ঘটেছিল আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ইয়োরোপে, তিনি তার দ্বারস্থ হয়েছিলেন এবং তা ছিল আংশিকতা ও আতিশয্যে ভরা। বলাকা [১৯১৬] কবিতাগ্রন্থে তিনি সম্পূর্ণ নিজের হয়ে উঠেছিলেন; তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে; কেননা এর আগে থেকেই ইয়োরোপে প্রতীকবাদের অবক্ষয়ের পরিণতি ও প্রতিক্রিয়ায় গড়ে উঠছিল একেকটি সংবেদনশীলতা। বিশ শতকের প্রথম দশকে ইমেজিসমের উত্থাপন ঘটল, যাতে জোর দেওয়া হলো আবেগগত ও বুদ্ধিজাত জটিলতার তাৎক্ষণিক প্রকাশের ওপর; রোম্যান্টিক-জর্জিয়ানদের বাচালতা ও অলংকারবাহুল্য থেকে মুক্তি এর অভিপ্রায় বলে মান্য হলো। আমি বলি না যে, এর বিশ্বস্ত অনুগামী বাঙালি কবিদের হতে হবে। বলি, কবিতার নিজস্ব এমন একটা পথ তৈরি করা দরকার, যা পূর্ববর্তী শূন্যতা, অসংগতি ও দুর্বলতা হয় পূরণ করবে, নয়তো সেই পরিসর গড়ে তুলতে হবে, যা আগে দেখা যায় নি। এটাও যদি সম্ভব না হয়, সমকালীন ধারার অগ্রবর্তী অংশটির সঙ্গে থাকা চাই। অনেক কিছুই বাঙলা ভাষায় সম্ভব করে তুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ; কবিতায়ও তাঁর এই কৃতিত্ব জরুরি ছিল। দুর্ভাগ্য হলো, তিরিশের কবিরা রবীন্দ্রকবিতাবলয় থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চাইলেও তাঁরা ঠিকমতো বের করতে পারেন নি রবীন্দ্রনাথের অর্জন ও বিসর্জনের সূত্র আর বাস্তবতা কী, পারলে তাঁদের [জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০) বাদে] কবিতাগুলোয় সেই লক্ষণ দেখতে পাওয়া যেত। রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিক সত্তা অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতে চলাচল করেছে; এর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, বুদ্ধদেব বসু [১৯০৮-১৯৭৪] খানিকটা ধরতে পারলেও [যেমন, ‘প্রান্তরে কিছুই নেই, জানালার পর্দা টেনে দে’/ আটচল্লিশের শীতের জন্য-২, যে আঁধার আলোর অধিক (১৯৫৪)] তা কোনো দার্শনিক প্রতীতি ও পরিণতি খুঁজে পায় নি। কোনো কবিকে লক্ষ্য ও উপলক্ষ বানিয়ে কবিতায় বিপ্লব ঘটানোর চিন্তা ও চেষ্টা যে কত বড় ভুল, প্রমাণ গত শতাব্দীর তিরিশের দশক। ঠিক তাহলে কী? জবাব খুব সহজ, তবে কাজটি সহজসম্ভব নয়। তা এই, কবিতার ইতিহাস যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু করা। সেটি করতে গেলে সমকালীন চিন্তাপ্রত্যয় ও শিল্পচৈতন্যকে সঙ্গে রাখতে হয়।

রবীন্দ্রসৃষ্ট কবিতাবৃত্ত থেকে বের হতে হবে, এই টেনশন জীবনানন্দ দাশের সম্ভবত ছিল না; সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কবিতায়ও তা লক্ষ করা যায় না। বাঙলা কবিতার ইতিহাস তখন যেখানে পৌঁছেছে, সেখান থেকে উভয়েই নিজের কবিতা লিখেছেন। তবে জীবনানন্দ দাশকে বাঙলা কবিতায় সবার আগে রাখতে চাই। কেননা, তিনি সৃষ্টি করেছেন একটা প্রতিপৃথিবী, যেখানে ব্রহ্মাণ্ড আর মানবপ্রকৃতির সূক্ষ্ম, জটিল ও গভীর প্রান্তগুলো মূর্ত, অর্ধমূর্ত, বিমূর্ত ও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। অধিকন্তু, একটা ভাষাজগৎ তিনি গড়ে তুলেছেন, যাতে বস্তুপ্রতিবেশ তার বিদিত বিদ্যমানতা ছেড়ে অন্যতর ও অনেকান্ত সময় ও পরিসর দাবি করে। ফলে, একেকটি পাঠে ব্যাখ্যা বদলে যেতে থাকে।

কবিতা শুরু করতে হয় সেখান থেকে, যেখানে তার ইতিহাস থেমেছে, একটু আগেই বলা হয়েছে। সেজন্য সর্বশেষ যে চেতনা ও প্রকরণধর্মের আধিপত্য, তা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। আমিও করেছি। তাতে আমার প্রেম নস্যাৎ হয়েছে। এটা খুব জরুরি। নইলে নিকট-অতীত বা সমকালীন কবিতা সম্পর্কে অসন্তোষ তৈরি হয় না। আমার ধারণা, সচেতন কবিমাত্রই বিদ্যমান কবিতা সম্পর্কে আপত্তি থেকে লিখতে বসেন, প্রেরণা বা আবেগের [তাৎক্ষণিক] চাপ থেকে নয়। যদি তা হয়ও, এক বিশেষ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে একটা অভিমুখ সৃষ্টি করা চাই। কিন্তু কী সেই অসন্তোষ, যা আমাকে লিখতে বসিয়েছিল? লক্ষ করেছি, নিকট-অতীত আর সমকালীন কবিতায় জীবনদৃষ্টি ও প্রকরণগত কোনো কেন্দ্র ও পরিধি নেই। যে যার খেয়ালখুশিমতো লিখছেন, তাতে বৈচিত্র্য থাকলেও উদাহরণ সৃষ্টির চেষ্টায় সবই শেষ হয়ে যাচ্ছে। আধুনিকতা সম্পর্কিত অপরিণত ধারণা এবং উত্তরাধুনিকতার খণ্ডিত ও অস্পষ্ট চর্চায় কবিরা মুহ্যমান। পুনরাবৃত্তি, বিবৃতি, সরল বর্ণনা, স্লোগান, আপ্তবাক্য, প্রথানুগত নিরীহ অলঙ্কার ইত্যাদি তাদের অধিকার করেছে। তবে আশির দশকের অন্তিমে এই গড্ডলিকা থেকে মুক্তির প্রয়াস করা হয়েছিল ‘গাণ্ডীব’ পত্রিকায়, একটা ইশতেহারের প্রকাশও ঘটেছিল। তাতে কাম্য পরিবর্তনের সূত্র, কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির কোনো স্পষ্টতা ছিল না। তবে এই সচেতনতা নবীন কবিদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল যে, পরিবর্তন দরকার।

আমি মনে করি, পৃথিবীর বিপুল-অধিকাংশ কবিতা  ‘লেখা’ হয়, কিছু ‘নির্মিত’ বা ‘রচিত’ হয়; খুব কম কবিতাই ‘সৃষ্টি’ হয়। পঞ্চাশের দশকের পরে, বিশেষত বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পর কবিতা হিসেবে যা-কিছু পাঠ করা গেছে, সেগুলির প্রায় সবই ‘লেখা’; কেননা কবিদের নাম বাদ দিয়ে পড়লে মনে হয়, একজনই লিখেছেন; কেননা, কোনোটির মধ্যেই দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকরণগত পৃথকত্ব নেই। এর মানে, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকরণ কোনোটিই নেই। এই শূন্যতা পূরণ করা হচ্ছিল কবিতার প্রাথমিক শর্তগুলি ব্যবহার করে একধরনের চালাকি, ফাঁকি ও প্রতারণাপূর্ণ কাব্যিকতা দিয়ে। ষাটের দশকের পর তিরিশ বছরে, বাঙলা কবিতার ভাষায় নতুন ক’টি একক যুক্ত হয়েছে, তা লক্ষ করলেই এটা বুঝতে পারা যায়।

দুই

আমার মনে পড়ছে ‘রেললাইন শুধু রেললাইন’ সিরিজ সৃষ্টিকালীন আচ্ছন্নতার কথা। একটা ঘুমের ওষুধের বিজ্ঞাপনের প্রিন্টেড লিটারেচার থেকে এর উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল। ওটা তেমন কিছু নয়, লেমিনেটেড বোর্ড পেপারের সেই ফোল্ডার, যা মেলে ধরলে নিচের ডান কোণের নীলাভ অন্ধকার থেকে উপরের বামকোণের গোধূলিরঙিন আলো পর্যন্ত একটা রেললাইন, খানিকটা বেঁকে যাওয়া, উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বাঁকের দুপাশে বাড়িঘর, কিছু পাথরের টুকরা ছড়িয়ে ছিল। কাগজের নিচের অংশে কোনো নদী কিংবা এর ধারণাজাগানো কিছু, অনুভূমিক, মুদ্রিত ছিল কি? বা, কোনো নৌকার গলুইজ্ঞাপক কিছু? যা হোক, একটা ট্যাগলাইন ছিল: ‘অ্যান আনইন্টারাপটেড স্লিপ’। বাংলায় অনুবাদ করলে হয় ‘নিরুপদ্রব ঘুম’ [আবার জীবনানন্দ দাশ!]। ছবিটি এমনভাবে আঁকা হয়েছে, মনে হয় নিদ্রার আরামদায়ক অন্ধকার থেকে একটা রেললাইন লোকালয় পার হয়ে জাগরণের স্বস্তিকর আলোর দিকে গেছে। বা, পৌঁছেছে। [ডিজাইনারের নাম জানা হয় নি; কিন্তু আমার ইন্দ্রিয় সেই শিল্পীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জমিয়ে রেখেছে] এই ভাবনায় দু-চারদিন আচ্ছন্ন থাকার পর ১৯৯৮ সালে, শীতের গভীর এক রাতে  লিখলাম,

‘নিদ্রা থেকে জাগরণে গিয়ে আমাদের রেলপথ
                         পুনরায় ঢুকে যায় ঘুমে
মাঝখানে রান্নাঘর, পরিত্যক্ত শয়নকুঠরি 
                    আর তরঙ্গিত আকাশের তল 
রাতভর কাঁপে জল, স্থির ঘাটে কাঁপে চালকরহিত নৌকা 
স্বপ্নের হাওয়াঢেউয়ে যখন নিদ্রিত আমাদের চুল

সূর্যের প্রসঙ্গ নেই, তবু ভোর আর গোধূলির টুকরাগুলি 
আমাদের পথের দুপাশে চতুষ্কোণ পাথরের মতো 
                                      প’ড়ে থাকে;

নীরবতা থেকে গান নৈঃশব্দ্যে ফিরে যায়
 
গন্তব্যের গাম্ভীর্য ছুঁতে চায় অন্যতর স্নায়ু…

অসংখ্য স্লিপারে আমরা রেখার ভারসাম্য রচনা করেছি;
তবু পটভূমি জাগরণে চৌচির, নিদ্রায় তলহীন নীল,                    
                               কখনো-বা অন্ধকার আর
আমাদের রেলগাড়ি স্টেশনবিমুখ, রাতভর প্রতিধ্বনিকামী’ 

কবিতার যন্ত্রপাতিগুলি অভিজ্ঞতামিশ্রিত কল্পনা এবং তজ্জনিত আচ্ছন্নতা থেকে ভাষাকে বের [মূর্ত] করে আনতে সাহায্য করে। আকার দেয়। যদিও এর লক্ষ্য শেষপর্যন্ত নতুন এক সৃষ্টিশীল অভিজ্ঞতার উদ্বোধন ঘটানো, আরেক আচ্ছন্নতার সমীপে পৌছানো। এমন সংগ্রামই কবিরা করে এসেছেন। কিন্তু কবির দায়িত্ব কি কেবল অভিজ্ঞতার কাব্যিক প্রদর্শনীর উপযুক্ত ভাষাপরিসর তৈরিতে নিঃশেষিত? কিংবা কলকবজাগুলি ব্যবহার করে কবিতা সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠিত ধারণার পুনরুৎপাদন? কোনো কবির তা কাম্য হতে পারে না নিশ্চয়, যদিও পৃথিবীর বিপুল-অধিকাংশ কবিতার নিয়তি এটাই। জানি না, যে-দৃষ্টান্ত ব্যবহার করা হয়েছে এই রচনায়, তাতে কী অনিবার্যতা মান্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু কবির সংগ্রামের রূপটি কেমন, খানিকটা বোঝানোর প্রয়াস এতে করা গেল। সবকিছু নিয়েই জীবন, কিন্তু শিল্পকলার একরকম সিলেকশন আছে, থাকে কিংবা ঘটে যায়। ফলে সব অভিজ্ঞতাই এর ব্যবহার্য হতে পারে না। যা-কিছু ব্যবহর্তব্য, সেগুলোয় সৃষ্টি করতে হয় অর্থ-অনর্থ ও সৌন্দর্যের ঐক্য। গড়ে তুলতে হয় অখণ্ড কিন্তু আপেক্ষিক ভাবের জগৎ। কেবল অভিজ্ঞতা দিয়ে তা সম্ভব নয়। চাই সৃষ্টিশীল কল্পনা, প্রাত্যহিকতা-পেরোনো ভাষা, কবিতা-সম্পর্কিত সমকালীন ধারণার স্বতন্ত্র প্রয়োগ ইত্যাদি। একটি রচনাকে কবিতায় উত্তীর্ণ করার জন্য এইসব দরকার। বেশির ভাগ কবি এবং পাঠক বলবেন ছন্দ, অলংকার আর বাকচিত্রের স্থান তাহলে কি নেই? বলি, আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু এগুলি প্রাথমিক শর্ত মাত্র এবং এসবের সীমা অতিক্রম করতে না পারলে ওই রচনা কবিতা হিসেবে প্রতিভাত হওয়ার শক্তি অর্জনে ব্যর্থ হয়। যা পাঠকালে তার আবশ্যকীয় উপাদানগুলির অস্তিত্ব মূর্ত হয়ে পড়ে, তা কবিতা নয়; বড়জোর কাব্যিক নিবন্ধ তৈরির অনুশীলন। কবিকে এই আবশ্যকীয় প্রাথমিকতা পেরিয়ে যেতে হয়।

আধুনিক কবিতাপ্রবাহের শৈশবে এডগার অ্যালান পো [১৮০৯-১৮৪৯] কবিতার জন্য দুটি অনিবার্য শর্তের কথা বলেছিলেন : একটি হলো ইঙ্গিতময় অনির্দিষ্টতা, অন্যটি সাংগীতিক বহিঃস্বর। [দ্র. দ্য পোয়েটিক প্রিন্সিপল (১৮৫০)] এর সঙ্গে আরেকটি যোগ করা যেতে পারে। সেটি হলো, অনির্ণেয় সমগ্রতা। বা, বলতে চাই, ওই দুটি মিলে তৈরি করবে এমন পথ, যা কবিতাকে অনির্ণেয় সমগ্রতায় নিয়ে যায় কিংবা সেই আকর্ষণ সৃষ্টি করে। পৃথিবীর সব শ্রেষ্ঠ রচনার মধ্যে এই তিনটির অস্তিত্ব চেষ্টাহীনভাবে পরিদৃশ্যমান।

তিন

চর্চার শুরু থেকেই আমার মনে হয়েছে, কবিতা মূলত এবং শেষপর্যন্ত দৃষ্টিভঙ্গির অনুশীলন। শিল্পকলার সব শাখার ক্ষেত্রে অবশ্য একথা প্রযোজ্য। সিলেকশন নিয়ে আগেই বলেছি। দৃষ্টিভঙ্গিও একধরনের গ্রহণ-বর্জনের বোধ থেকে তৈরি হয় এবং এতেই নির্ধারিত হয়ে যায় কবির শব্দরুচি, স্বেচ্ছাচারিতা, সংস্কার, উদারতা, অভিপ্রায় ইত্যাদি। কিছু ভাববাচক ও ধারণাজাত শব্দ যেমন আমি সচেতনভাবে বর্জন করেছি [হৃদয়, আত্মা, ঈশ্বর, প্রভু, স্বর্গ, নরক, সত্য, অমরতা, প্রার্থনা ইত্যাদি]। বর্জন করার জন্য গ্রহণ করতে হয়। আমার প্রথম কবিতাগ্রন্থে  [চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩)] এই শব্দগুলো কিছু কম হলেও, আছে। থাকলেই-বা কী! সেগুলি তো আমার জীবনদৃষ্টিকে পূর্ণরূপে দ্যোতিত করে নি। ‘প্রার্থনা’ শব্দটি দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থে [অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬)] একবার মাত্র ব্যবহার করা হয়েছে; এমনভাবে, যাতে ভাববাচকতার আফিম স্নায়ুকে গ্রাস না করে। অন্যদিকে, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেসব শব্দ বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো এড়ানোর প্রয়াস করেছি। তবে ‘অন্ধকার’ শব্দানুষঙ্গ বহুবার নানাভাবে ব্যবহার করেছি। জীবনানন্দ শব্দটির ওপর নিজের যে মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাতে ব্যাঘাত সৃষ্টির জন্য। ‘আঁধার’ শব্দটি একবারও ব্যবহার করি নি। লক্ষ করেছি, বারবার প্রয়োগ করতে গিয়ে বাঙলার কবিরা একে ফ্যাকাশে করে ফেলেছেন। আশির দশকে, এমন-কি সমকালীন কবিরাও যখন বহু-ব্যবহৃত এই শব্দানুষঙ্গ এড়াতে পারেন না, তখন বিরক্ত হই। বোধ করি, বাংলা কবিতায় আঁধারের অন্ধকার কখনো ঘুচবে না। অধিকন্তু, শব্দটি রোম্যান্টিক হেঁয়ালিতে ভরে আছে বলে মনে হয়। যা হোক, সিলেকশনের বিষয়ে নিজের শব্দরুচিকে পূর্বনির্ধারিত ও সক্রিয় রেখেছি। সে-ক্ষেত্রে সমকালীন [নিজের। কবির প্রধান সংগ্রাম সমকালীন হওয়ার সংগ্রাম; কিন্তু গণমাধ্যমগুলির ভাষায় যেভাবে সমকালীন হওয়ার চেষ্টা দেখা যায়, ব্যাপারটা সেরকম স্থূল নয়] হয়ে ওঠাই প্রধান বিবেচ্য হয়েছে। বাকি যা-কিছু, উন্মুক্ত রেখেছি।

শব্দ নিয়ে প্রসঙ্গক্রমে দু-চার কথা এসে পড়লেও, কবিতায় আমার অভিপ্রায় নৈঃশব্দ্য সৃষ্টি করা। মানে, এক নীরবতা থেকে অন্য নীরবতায় পৌছানো। এমনটি চাইলে কবিতার প্রাথমিক শর্তগুলো যাতে আড়ালে চলে যায়, সেই অনুশীলনের প্রয়োজন। কোনো কবিতা পাঠকালে বা পাঠের পর আর সব বৈশিষ্ট্য ছাপিয়ে ছন্দের উপস্থিতি যদি প্রবল হয়ে ওঠে, বা, এর পাশাপাশি বাকচিত্র, অলংকার ইত্যাদি মনোযোগ আকর্ষণ করে, তবে তাতে নীরবতা নষ্ট হয়ে যায়। রচনাটি কোলাহলে রূপ নেয়। প্রকরণে ভারসাম্য বলে কিছু থাকে না। তাহলে কিভাবে গড়ে ওঠে নৈঃশব্দ্য? যন্ত্রপাতিগুলো লুকিয়ে রাখার কথা তো বলা হয়েছে। ভাববস্তুরও উন্মোচন ঘটানো যাবে না পুরোপুরি। প্রতীকবাদীরা তিন-চতুর্থাংশ আড়ালে রাখার অনুশীলন করেছেন। আমি বলি, ভাববস্তু অর্ধেক পর্যন্ত উন্মোচিত হতে পারে। কিন্তু এই অংশটিকে, আড়ালে রাখা ভাববস্তুর ইঙ্গিত-সংকেত-প্রতীকে পূর্ণ করে তুলতে হয়। এটা সম্ভব হলে নতুন এক বিভ্রমের জগৎ সৃষ্টি হয়ে যায়। ফলে, পুরোপুরি উন্মোচনের আশায় পাঠক বারবার সেই জগতে প্রত্যাবর্তনের প্ররোচনা অনুভব করে। এসব কথা বলছি শ্রেষ্ঠ ও প্রসিদ্ধ এমন কিছু কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে, যেগুলোর মর্ম অফুরন্ত, ব্যাখ্যা বিচিত্রমুখী, বিশ্লেষণ জটিল ও পরিবর্তনশীল। কিন্তু বাস্তবিক, কবিতার এমন কোনো পূর্বশর্ত নেই, যার অনুগত হলে তা পরিপূর্ণভাবে রচনা করা সম্ভব।

চার

কবিকে নিজের কাছে স্বাধীন হতে হয়। এর মানে হলো, যা-কিছুর মধ্যে সে রয়েছে এবং তার মধ্যে যা-কিছু আছে—সেসবের থেকে নিজেকে মুক্ত করা। এটা সম্ভব হলে বিদ্যমান থেকে তার উত্তরণ ঘটে। কবি যখন নিজের কাছে মুক্ত হন, তখন ‘অন্য’ বলে কিছুই আর থাকে না। কোনো সংস্কার, প্রথা, বিধিবিধান তাকে বিরক্ত বা বিচলিত করতে পারে না। একটা সমুদ্র তখন তৈরি হয়ে যায়, যাতে জীবনের, পৃথিবীর আলোকরেখা এসে বেঁকে যায়। এই প্রতিসরণপরিসর থেকে নতুন অথচ অনির্ণেয়, প্ররোচনাময় কিন্তু সুখকর বিভ্রমের জগৎ গড়ে ওঠে।

Author

মাহমুদুর রহমান

Follow Me
Other Articles
Next

টিনেজ সিরিজ থেকে

No Comment! Be the first one.

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক পোস্ট

  • কবি মাহিরা রুবির পাঁচটি কবিতা
  • টিনেজ সিরিজ থেকে
  • কী ভেবেছি সারাবেলা

বিভাগসমূহ

  • উপন্যাস
  • কবিতা
  • গল্প
  • প্রবন্ধ
  • সাক্ষাৎকার

নির্বাচিত

  • কবি মাহিরা রুবির পাঁচটি কবিতা
    by মাহমুদুর রহমান
    July 19, 2026
  • কী ভেবেছি সারাবেলা
    by মাহমুদুর রহমান
    October 1, 2025
  • টিনেজ সিরিজ থেকে
    by মাহমুদুর রহমান
    July 19, 2026
  • কবি মাহিরা রুবির পাঁচটি কবিতা
    by মাহমুদুর রহমান
    July 19, 2026

Search...

মেঘপত্র এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে লেখকরা তাঁদের গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা এবং সৃজনশীল লেখালেখি সহজেই প্রকাশ করতে পারবেন। আমরা বাংলা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ ও সহজলভ্য করে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করছি।

  • Facebook
  • X
  • Instagram
  • LinkedIn

Latest Posts

  • টিনেজ সিরিজ থেকে
    ০১ রুমডেট ডাংগুলির আপডেট ভার্সান। এই তথ্য জানতে গিয়ে একদা… Read more: টিনেজ সিরিজ থেকে
  • কী ভেবেছি সারাবেলা
    এক কেউ যখন কবিতার নিরবচ্ছিন্ন প্রেমে পড়ে, সম্ভবত তখন থেকে… Read more: কী ভেবেছি সারাবেলা
  • কবি মাহিরা রুবির পাঁচটি কবিতা
    শিমুলের আয়ু*ঢেউঢেউ জল নিয়ে উঠোনে নদী এলে দোর খুলিনা, তাড়িয়ে… Read more: কবি মাহিরা রুবির পাঁচটি কবিতা

Pages

  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ করুন
  • Terms and conditions

Pages

  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ করুন
  • Terms and conditions

Contact

Phone

+880 1913-020397

Email

info@meghpotro.com

support@meghpotro.com

Location

Khulna, Bangladesh

সমন্বয়ক: মাহমুদুর রহমান । অলংকরণ : মেঘপত্র টিম । ই-মেইল: tsakib360@gmail.com | কপিরাইট 2026 | মেঘপত্র | Reflacode